হাওজা নিউজ এজেন্সি: বক্তব্যে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবার তথা আহলে বাইতের সদস্যদের বন্দী করে কুফা থেকে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে নিয়ে যাওয়ার সময় সংঘটিত এক হৃদয়বিদারক ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, উমাইয়া শাসকগোষ্ঠীর ব্যাপক অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার কারণে বহু সাধারণ মানুষ বন্দী কাফেলাকে বিদ্রোহী মনে করত। এমনই এক বৃদ্ধ বন্দীদের উদ্দেশে বলেছিল, “আল্লাহর শুকরিয়া, যিনি তোমাদের হত্যা করেছেন, তোমাদের ধ্বংস করেছেন এবং আমীরুল মুমিনীন (ইয়াজিদ)-কে তোমাদের ওপর বিজয় দিয়েছেন।”
বক্তা বলেন, এ কথার জবাবে ইমাম আলী ইবনুল হুসাইন জয়নুল আবেদীন (আ.) অত্যন্ত ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও কুরআনের আলোকে ওই বৃদ্ধকে সত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি প্রথমে জানতে চান, বৃদ্ধ কুরআন পড়েছেন কি না। ইতিবাচক উত্তর পেয়ে ইমাম (আ.) ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করেন।
প্রথমে তিনি সূরা আশ-শূরা-এর ২৩ নম্বর আয়াত পাঠ করেন—
قُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى.
“বলুন, আমি এ কাজের জন্য তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না; চাই শুধু আমার নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা।”
(সূরা আশ-শূরা, ৪২:২৩)»
এরপর ইমাম (আ.) বলেন, “আমরাই সেই ‘কুরবা’ (নিকটাত্মীয়)।”
এরপর তিনি সূরা আল-ইসরা-এর ২৬ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন—
وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا.
“আত্মীয়কে তার প্রাপ্য প্রদান করো, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও; আর অপচয় করো না।”
(সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৬)
ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) বলেন, “আমরাই সেই আত্মীয়, যাদের অধিকার আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
সবশেষে তিনি সূরা আল-আহযাব-এর ৩৩ নম্বর আয়াতের অংশ তিলাওয়াত করেন—
إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا.
“আল্লাহ তো শুধু চান, হে আহলে বাইত! তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পরিপূর্ণরূপে পবিত্র করতে।”
(সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩৩)
ইমাম (আ.) বলেন, “আমরাই সেই আহলে বাইত।”
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মুহাম্মাদ শরিফুল ইসলাম বলেন, কুরআনের এসব আয়াত ও ইমামের বক্তব্য শুনে বৃদ্ধ নিজের ভুল উপলব্ধি করেন। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আল্লাহর কসম! আমি জানতাম না যে, আপনারাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আহলে বাইত। আমি আল্লাহর কাছে তওবা করছি।” জবাবে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) বলেন, “যদি তুমি আন্তরিকভাবে তওবা করো, তবে আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করবেন।”
বক্তা বলেন, এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে সত্য প্রতিষ্ঠায় ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও কুরআনভিত্তিক যুক্তি উপস্থাপনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি উল্লেখ করেন, আল-ইহতিজাজ, বিহারুল আনওয়ার, আল-লুহূফ (ঘটনার সারাংশ) এবং মাকতালুল হুসাইন-সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে বর্ণিত এই ঘটনাটি এটাও উল্লেখ করে যে আহলে বাইতের (আ.) বিরুদ্ধে বনী উমাইয়া কী পরিমাণ মিথ্যাচার ও ঘৃণা ছড়িয়েছিল।
অনুষ্ঠানে বক্তা কারবালার শিক্ষা থেকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা, জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ধারণের আহ্বান জানান। শোক মজলিসে এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, আলেম-উলামা ও আহলে বাইতপ্রেমী মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
আপনার কমেন্ট